বাস্তবতা এবং তথাকথিত প্রগতিশীলতা

 তেলের পরে ভেনেজুয়েলার সাথে আমেরিকার সবচেয়ে যে জিনিসটার প্রতিযোগিতা চরমে তা হল 'সুন্দরি প্রতিযোগিতা' । ডেটা খুঁজুন দেখবেন মিস ইউনিভার্স, মিস ওয়ার্ল্ড এসব অনুষ্ঠানে আমেরিকার সাথে ভেনেজুয়েলার রীতিমত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। এ পর্যন্ত আমেরিকা মিস ওয়ার্ল্ডে ৯ বার বিজয়ী হয়েছে যা সর্বচ্চ আর দ্বিতীয় স্থানে ভেনেজুয়েলা ৭ । মিস ওয়ার্ল্ডে সর্বচ্চ ৬ । মিস ইন্টারন্যাশনালে সর্বাধিক আট। এরকম যত সুন্দরি প্রতিযোগিতার আয়োজন আছে এরমধ্যে প্রথম সারির 'বিগ সিক্স' অর্থাৎ মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ইউনিভার্স সহ আরো চারটি প্রতিযোগিতায় ভেনেজুয়েলা মোট সর্বচ্চ ২৪ টি  আন্তর্জাতিক ক্রাউন জিতেছে। অর্থাৎ ভেনেজুয়েলা সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় একটি পাওয়ার হাউজ হিসেবে খ্যাত।

.

এটা যেনতেন কোন বিষয় নয়। ভেনেজুয়েলার গোটা সমাজটাই সুন্দরী প্রতিযোগিতার ব্যাপারে মুখিয়ে থাকে। বিশ্বমঞ্চের প্রতিযোগিতা বাদ দিলেও তাদের আঞ্চলিক যে প্রতিযোগিতা সেগুলো নিয়ে রীতিমত হাড্ডহাড্ডি লড়াই হয়। বাবা মায়েরা তার মেয়ে শিশুকে নিয়ে স্বপ্ন বোনে যে তার মেয়ে হয়তবা ক্যাট ওয়াক করে বিচারকের মনে ঝড় তুলবে তারপর মেয়ে বড় কোন অর্থ পেয়ে তাদের সংসার চালাবে। নারীর পোষাক এবং সৌন্দর্য প্রদর্শনকে যদি কোন সমাজের প্রোগ্রেসিভের উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় তাহলে ভেনেজুয়েলাকে আপনাদের শীর্ষ স্থান দিতে হবে। ভেনেজুয়েলাতে শিশুদেরকে যেভাবে সুইম স্যুইট পড়িয়ে হাজার মানুষের সামনে ক্যাট ওয়াক করানো হয় সেই ছবি ভিডিও ফেইসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রামের নতুন অ্যালগারিদমে আটকিয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকতে পারে কেননা সেগুলো ঘুরেফিরে পেডোফাইলের খোরাকই হবে। কিন্ত এগুলো নিয়ে ভেনেজুয়েলানদের বিন্দুমাত্র কোন আফসোস নেই। 

.

যে শিশুকে দাড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরী প্রতিযোগিতার জন্য সে বড় হয়ে এ জীবনটাকেই সুখবোধ নিয়ে গ্রহন করে। প্রচন্ডরকম সেক্সুয়ালাইজড সমাজ হল ভেনেজুয়েলা। সুন্দরী প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানগুলো লাখ লাখ মানুষ বুঁদ হয়ে টেলিভিশনে দেখতে থাকে। আবাল বৃদ্ধ, জুয়ান কোন পার্থক্য নেই। তারা তাদের নিজ কন্যাদেরকে নাম মাত্র পোষাকে হাঁ করে দেখতে তাদের মধ্যে কোন লজ্জা শরম তৈরি হয় না। বরং গর্ব অনুভব করে। ২০১৮ সালে হলিউডে মি টু আন্দোলন হলে মিস ইউনিভার্স সহ আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোতে সুইম স্যুট পরে হাটা বাদ দেওয়া হলেও ভেনেজুয়েলার আঞ্চলিক সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোতে এগুলো কোন পাত্তা পায় নি। তারা অ্যায ইউজুয়াল সুইম স্যুইট কে রেখে দেয়। এটা বাদ দেওয়ার আলোচনাও উঠেনি। বরং সুইম স্যুট পরে সুন্দরী নারীদেরকে হাটানোটাই হচ্ছে সুন্দরী প্রতিযোগিতার সবচেয়ে প্রাক্টিক্যাল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা বাদ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। 

.

আঞ্চলিক সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোতে তারা বিজয়ী হয়ে তারা যে অর্থ লাভ করে তা তাদেরকে আরো দূরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করে। হয়তবা সে তার ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করাতে পারবে কিংবা কোন সার্জারি করিয়ে তার চেহারার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলতে পারবে। আর নয়তো তারা এখন থেকে ফ্ল্যাটে বসবাস করতে পারবে। 

.

এক সুন্দরী প্রতিযোগিতার অংশগ্রহনকারী তার স্মৃতিচারণমূলক বইতে লিখেছে , "“আমি দ্রুত বুঝে গিয়েছিলাম যে মিস ভেনেজুয়েলা প্রতিযোগিতায় ঢুকতে হলে একজন স্পনসর জোগাড় করার জন্য আমাকে নিজেকে দেহব্যবসায় নামাতে হবে,” তিনি লেখেন। “সবার ক্ষেত্রে এতটা করতে হয়নি, কিন্তু এটাই ছিল আমার বাস্তবতা।” এরকম অভিযোগ প্রায়ই আসে। যে বুড়ো কারো সাথে সেক্স করে সুন্দরী প্রতিযোগিতার জন্য গাউনের টাকার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে কিংবা সার্জারির জন্য টাকার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কিন্ত ভেনেজুয়েলাতে সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে যে পরিমাণ হাইপ তা এগুলো বেশিদিন ধোপে টিকে না।

.

ডাক্তার, ল ইয়্যার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারী কিংবা টেকসই পেশাতে থাকা নারীরা সুযোগ থাকলেই এই সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোতে অংশগ্রহন করতে চায়। তারা মনে করে সৌন্দর্যের দ্বারা বিজয়ী হলে তা আমাকে আরো ক্ষমতাবান করে তুলবে। ভেনেজুয়েলাতে বাস্তবতাও এরকমই। অনেক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া নারীরা নির্বাচনে অংশগ্রহন করে বিজয়ী হয়ে মেয়র কিংবা মূল নির্বাচনে বিরোধী দলের নেত্রী হওয়ারও রেকর্ড আছে।

.

অথচ অথচ অথচ এত প্রোগ্রেসিভ একটা সমাজ যেখানে নারীরা সম্পন্ন স্বাধীন তার দেহের সৌন্দর্য প্রদর্শন করার ব্যাপারে। যে সমাজ সৌন্দর্য প্রদর্শনকে নেগেটিভ হিসেবে না নিয়ে আরো রেস্পেক্টভলি গ্রহন করে সেই প্রোগ্রেসিভ সমাজে এই সুন্দরী নারীরা এখন ভেনেজুয়েলার এই অবস্থায় কি কাজে লাগছে ? বলুন আপনারা । এত সুন্দরীর একটা দেশে প্রেসিডেন্ট কয়েক ঘন্টার রেইড দিয়ে আমেরিকা নিয়ে যেতে পারে সেই দেশে এত প্রোগ্রেসিভ নারী কি কাজে লাগল ? পুরুষদের যৌন ক্ষুধা মেটানো ছাড়া এদের আর কি কোন ব্যবহার আছে ? ভেনেজুয়েলাকে কি এই সুন্দরি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া কিংবা মেডেল পাইয়ে দেওয়া নারীরা কোন পেশী শক্তি যোগ করতে পেরেছে ? এত প্রোগ্রেসিভ নারী থাকা সত্ত্বেও এই দেশ কি আর কোনদিন তাদের এই অপমানের গ্লানি মুছতে পারবে ? পারবে না। কোনদিনও ইতিহাস তারা ফিক্স করতে পারবে না। যৌনতাকে উন্মুক্ত করে দিয়ে পোষাকের পরিধি কমিয়ে দিয়ে স্বাধীনতার নাম দিয়ে পুরুষদের সামনে নিজের ইচ্ছেমত কলা কৌশল করে বিজয়ী হওয়া যদি কোন রাষ্ট্রের আসল উন্নতিতে কোন কাজে লাগত তাহলে আর এত গবেষণাগারের জন্ম হত না। নারীদের তো সৌন্দর্য নিয়েই  জন্ম হয় কিন্ত তা উন্মুক্ত করে যদি পৃথিবীকে আপদ থেকে বাচানো যেত তাহলে মানুষ সবকাজ থেকে অবসর নিয়ে নারী নিয়েই পড়ে থাকত। কিন্ত বাস্তবতা তো এটাই দেশের নারীদের জন্য গান শেখা , নাচ শেখা, ব্যালেট আপনি সমস্ত কিছু শিক্ষার জন্য উন্মুক্ত করে দিন, ফ্রি করে দিন। তারা শিখল, গাইল , নাচল। বিশ্বের মঞ্চে সবাই একেকটা শিল্পী হয়ে বিজয়ী হয়ে আসল। কিন্ত দিনশেষে এগুলো সবই পরাশক্তির মিসাইলের কাছে মূল্যহীন। বরং পুরো অর্থ বিনিয়োগই বেকার। 

.

এজন্য এই দেশের নারীদেরকে উন্মুক্ত করার পিছনে এই দেশের হুজুরদের কিংবা ইসলামপম্থীদের যে নাখোশ ভাব তা একারণেই যে তারা বাস্তববাদী। তারা দেশের অর্থগুলোকে এরকম স্থানে বিনিয়োগ করাতে চায় যেখানে বিনিয়োগ করলে দেশের পেশীশক্তি বৃদ্ধি পাবে। রবীন্দ্রনাথ আর হারমোনিয়াম দিয়ে বসিয়ে দিলে যে নারীরা আরো নির্জীব হয়ে উঠবে আর তাদের সাথে এই রাষ্ট্রও নির্জীব হয়ে উঠবে , লাক্সের সুন্দরি প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিলে দিনশেষে তা পুরুষদের খোরাক হিসেবেই বিবেচিত হবে যার রাষ্ট্র গঠনে কোন ভূমিকা নেই এগুলোর নিন্দা করাটাই বরং বাস্তববাদিতার উদাহরণ। এগুলোর সাথে প্রোগ্রেসিভের কোন সম্পর্ক নেই। এগুলোর সাথে দিনশেষে যৌনতার সম্পর্ক। বরং গরিব রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই সব কথিত প্রোগ্রেসিভ আরো ধাধার জন্ম দেয়। তারা মনে করে আমার মিসাইল বানানোর দরকার নাই, আমার নারীরা যা ইচ্ছে তাই পড়তে পারে। আমার অস্ত্র নিয়ে গবেষণার দরকার নাই,  আমাদের নারীরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দরকার নাই আমাদের নারীরা যা ইচ্ছে তাই পরিধান করে চলাফেরা করতে পারে। একটা রাষ্ট্রের সব নীতিকে নারীকেন্দ্রিক বানানো হয়। আর গরীব দেশগুলোও মনে করে আমাদের নারী স্বাধীনতা এত এত বেশি যে খোদ আমেরিকার মত পরাশক্তিও তার প্রশংসা করে। আমাকে আর ঠেকায় কে। আর এদিকে আমেরিকা খুবই খুশি যাক গরিব দেশগুলোর সব চিন্তাকে নারী কেন্দ্রিক বানিয়ে দিয়েছি এখন ওরা নারী নিয়েই পড়ে থাকবে আর কোন কিছুতে ওরা মনোযোগ দেওয়ার সুযোগই পাবে না। 

Notes: ভেনেজুয়েলার সুন্দরী প্রতিযোগিতা সংশ্লিষ্ট হাইপ নিয়ে দুটো প্রতিবেদনের স্ক্রিন শট শেয়ার করা হল। একটা গার্ডিয়ান পত্রিকার অন্যটি এনবিসি-র। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে দেখুন গোলাপি ড্রেস পরা ছোট্ট একটা মেয়ের ছবি সে কিভাবে হিল পরে উপরের দিকে পা তুলছে। সে হয়তবা জানেও না তাকে তার সেক্সুয়ালাইজড সমাজের খোরাক হিসেবে তাকে তৈরি করা হচ্ছে।

Comments

Popular posts from this blog

So called progressiveness and our reality

লিবারেল ডেমোক্রেসির ইসলাম বিদ্বেষীতার মুখোশ